আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার ঘোষণা
দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দলটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে
মেয়র প্রার্থী হিসেবে আতিকুর রহমান মুজাহিদ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি
করপোরেশনে হাফেজ মাওলানা ফজলুল করিম মারুফের নাম ঘোষণা করেছে। সোমবার
রাজধানীর পুরান পল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে
মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন দলের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ
রেজাউল করীম।
রেজাউল করীম
বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য ইসলাম, দেশ ও মানবতার কল্যাণ
নিশ্চিত করা। ইসলামী নীতি-আদর্শের মাধ্যমেই প্রকৃত কল্যাণ প্রতিষ্ঠা
সম্ভব।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ভূমিকা ছিল
গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনের সময় নিরপরাধ মানুষ, শিক্ষার্থী, হাফেজ ও আলেমদের
হত্যার প্রতিবাদে তাদের দল রাজপথে সক্রিয় ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রেজাউল করীম বলেন, আমাদের অনেক নেতা-কর্মী, ভাই এবং ছাত্র ও সহযোগী সংগঠনের
সদস্য শাহাদাত বরণ করেছেন। বৈষম্য দূরীকরণ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবিতে আমরা
অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ করেছি।
দেশের
রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে চরমোনাই পীর বলেন, স্বাধীনতার
৫৩ বছর পার হলেও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও
ন্যায়বিচার বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গত পাঁচ দশকে যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা
জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর
দেশে একটি নতুন সম্ভাবনার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন
ক্ষমতায় ছিল, তারা আবার ক্ষমতায় এলে মানুষ নতুন কিছু পাবে এমন আশা করা যায়
না।
রেজাউল করীম জানান, এ
কারণেই তারা কওমি ঘরানার ইসলামী দলগুলোকে একত্রিত করার উদ্যোগ নেন। পরে
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৃহত্তর
নির্বাচনী সমঝোতার চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি দাবি করেন, সেটি কোনো রাজনৈতিক
জোট ছিল না; বরং দেশ পরিচালনায় একটি সমন্বিত সমঝোতার উদ্যোগ ছিল।
তিনি
বলেন, জোট ও সমঝোতার মধ্যে পার্থক্য আছে। জোট হয় নেতৃত্বকেন্দ্রিক। কিন্তু
আমরা বলেছিলাম, কোনো দলের নেতৃত্বে জোট নয়, বরং সমঝোতার ভিত্তিতে সবাই কাজ
করবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে পাঁচটি ইসলামী দলকে নিয়ে একটি লিয়াজোঁ
কমিটি গঠন করা হয়। প্রতিটি দল থেকে দুজন প্রতিনিধি সেখানে ছিলেন এবং যৌথ
পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। পরে এই উদ্যোগ আট দলে বিস্তৃত হয়।
রেজাউল
করীম বলেন, তাদের পক্ষ থেকে গণভোট, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং জুলাই সনদ
বাস্তবায়নের দাবি সামনে আনা হয়েছিল। এসব বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের
ওপর চাপ প্রয়োগের লক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল বলেও জানান
তিনি।
তবে পরবর্তীতে জামায়াত
সমঝোতাকে জোটে রূপ দিতে চেয়েছে বলে অভিযোগ করেন ইসলামী আন্দোলনের আমির।
তিনি বলেন, আমরা লক্ষ্য করি, জামায়াত নেতৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছে। তখন আমি
তাদের বলেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা দিয়ে জাতীয়
নির্বাচন বিচার করা ঠিক হবে না। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এক বৈঠকে জামায়াতের
সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ২০০ আসন নিজেদের জন্য এবং ১০০ আসন
শরিকদের জন্য রাখার কথা বলেছিলেন। যদিও পরে সেটিকে ব্যক্তিগত বক্তব্য
হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।
রেজাউল
করীম বলেন, আমরা তো জোট করিনি, সমঝোতা করেছি। আসন বণ্টনের সিদ্ধান্ত যৌথ
আলোচনার ভিত্তিতে হওয়ার কথা ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত তাদের সঙ্গে
আলোচনা ছাড়াই জাতীয় নাগরিক পার্টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি, লিবারেল
ডেমোক্রেটিক পার্টি ও খেলাফত মজলিসের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করে আসন
দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছিল। এতে সমঝোতার পরিবেশ নষ্ট হয় বলে দাবি করেন তিনি।
এছাড়া
জামায়াতের বিরুদ্ধে বিদেশি পক্ষের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের অভিযোগও তোলেন
চরমোনাই পীর। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি তারা আমেরিকা, খ্রিষ্টান মিশনারি ও
ভারতের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, জামায়াতের কয়েকজন
নেতা বিদেশি কূটনৈতিক মহলে ইসলামী আন্দোলনকে উগ্রবাদী ও জঙ্গিবাদী হিসেবে
উপস্থাপন করেছেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও এসময় মন্তব্য করেন তিনি।
পরবর্তীতে
ইসলামী আন্দোলন আবার প্রথম পাঁচ ইসলামী দলকে নিয়ে বৈঠক করে জামায়াত ছাড়া
নতুনভাবে এগোনোর প্রস্তাব দেয়। তবে অন্য দলগুলো জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক
ছিন্ন করতে রাজি না হওয়ায় ইসলামী আন্দোলন এককভাবে পথ চলার সিদ্ধান্ত নেয়
বলে জানান রেজাউল করীম।
বিএনপির
সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দল
তাদের জোট বা সমঝোতার বিনিময়ে এমপি, মন্ত্রীত্বসহ নানা প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে ইসলামী আন্দোলন ক্ষমতা বা সম্পদের জন্য রাজনীতি করে না বলে দাবি করেন
তিনি। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ঐক্যের বিষয়ে তিনি বলেন, যারা নিঃস্বার্থভাবে
ইসলাম, দেশ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করবে এবং ক্ষমতা বা সম্পদের লোভে
পরিচালিত হবে না, তাদের সঙ্গেই ভবিষ্যতে আমাদের ঐক্য হতে পারে।
জুলাই
সনদ প্রসঙ্গে রেজাউল করীম জানান, গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় রাজনীতিতে যে
প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের দিকে তারা নজর রাখছেন। তবে জাতীয়
নির্বাচনের পর সাংগঠনিকভাবে কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলেও স্বীকার করেন
তিনি।
তিনি জানান, বর্তমানে দলকে আরও শক্তিশালী ও কাঠামোবদ্ধ করার কাজ চলছে।
অন্তর্বর্তীকালীন
সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তির সমালোচনা করে
তিনি বলেন, সেটি দেশের জন্য কল্যাণকর নয় এবং এতে ‘গোলামির চরিত্র’ ফুটে
উঠেছে। বিষয়টি সংসদে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানান তিনি।
ভারতের
পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন,
ধর্মনিরপেক্ষতার নামে সেখানে পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
চরমোনাই
পীর বলেন, ৫ আগস্টের পর মন্দির ও উপাসনালয় পাহারা দিয়ে আমরা দায়িত্বশীলতার
পরিচয় দিয়েছি, যাতে ভারত এটিকে ইস্যু করে অরাজকতা সৃষ্টি করতে না পারে।
প্রশাসনের
বিভিন্ন নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ
নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ব্যক্তি স্বার্থ, ক্ষমতার লোভ ও
অর্থের মোহ ত্যাগ করে দেশ গঠনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান
ইসলামী আন্দোলনের আমির।
সভায়
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউনুছ আহমাদ, দলীয় মুখপাত্র গাজী আতাউর
রহমান, প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন, যুগ্ম মহাসচিব ফজলে বারী মাসউদ,
আশরাফুল আলম, সহকারী মহাসচিব আহমাদ আবদুল কাইয়ুম, সহপ্রচার সম্পাদক
শরীয়াতুল্লাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।