মিরপুরের আকাশে তখনও ছিল প্রথম দিনের উজ্জ্বলতার রেশ।
নাজমুল হোসেন শান্তর সেঞ্চুরি আর মুমিনুল হকের দৃঢ়তায় বাংলাদেশ দিন শেষ
করেছিল শক্ত ভিত গড়ে। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট যে একদিনের গল্প নয়, সেটিই যেন
নির্মমভাবে মনে করিয়ে দিল পাকিস্তানের ব্যাটাররা।
দ্বিতীয়
দিনের শুরুতে মোহাম্মদ আব্বাসের নিখুঁত বোলিংয়ে ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের
ইনিংস, আর দিনের শেষভাগে দুই অভিষিক্ত ওপেনার আজান আওয়াইজ ও আব্দুল্লাহ
ফজলের আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিংয়ে ম্যাচে জোরালো প্রত্যাবর্তন করেছে সফরকারীরা।
দিন শেষে তাই প্রথম দিনের আনন্দ মিলিয়ে গিয়ে বাংলাদেশ শিবিরে জায়গা নেয়
হতাশা।
মিরপুর
টেস্টের দ্বিতীয় দিনে ৪ উইকেটে ৩০১ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ।
প্রত্যাশা ছিল অন্তত ৪৫০ ছোঁয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন বেশিদূর এগোয়নি। শেষ
পর্যন্ত প্রথম ইনিংসে ৪১৩ রানেই থেমে যায় স্বাগতিকরা। ৩৯তম জন্মদিনে
মুশফিকুর রহিম খেলেন ৭১ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস। তবে দিনের আসল নায়ক ছিলেন
পাকিস্তানের অভিজ্ঞ পেসার মোহাম্মদ আব্বাস। নিখুঁত লাইন-লেন্থ আর ধারাবাহিক
সুইংয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিংকে ছিন্নভিন্ন করে ৫ উইকেট শিকার করেন তিনি।
বাংলাদেশের
ইনিংসের শুরুটা অবশ্য ছিল আশাব্যঞ্জক। দিনের প্রথম ঘণ্টা নিরাপদে পার করার
লক্ষ্য নিয়ে নেমেছিলেন মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাস। দুজনই ধৈর্য ধরে
খেলছিলেন। ১১৪ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন মুশফিক। তবে পানি বিরতির ঠিক
আগমুহূর্তে ভাঙে এই জুটি। ক্যারিয়ারে বহুবারের মতো এবারও ভালো খেলতে খেলতেই
নিজের উইকেট ছুড়ে দেন লিটন। ৩২ রানে সিøপে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যাওয়ার পর
আরেকটি দৃষ্টিকটু পুল শটে মিড-অনে ক্যাচ তুলে দেন তিনি।
আব্বাসের
অব স্টাম্পের বাইরের শর্ট বল খেলতে গিয়ে বিদায় নেন ৩৩ রান করে। এরপর
মেহেদী হাসান মিরাজ ক্রিজে এসে প্রথমেই আত্মবিশ্বাসী এক পুল শটে ছক্কা
হাঁকান আব্বাসকে। কিন্তু পরের বলেই পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান। মুহূর্তেই
চাপে পড়ে বাংলাদেশ।
তাইজুল
ইসলাম কিছুক্ষণ মুশফিককে সঙ্গ দিলেও জুটি বড় হতে দেননি আব্বাস। ১২৬
কিলোমিটার গতির শর্ট বলে কিপারের হাতে ক্যাচ দেন তাইজুল (১৭)। লাঞ্চের
পরপরই আসে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। ধীরস্থির ব্যাটিংয়ে এগোতে থাকা মুশফিকুর
রহিমকে বোল্ড করেন শাহিন শাহ আফ্রিদি। তার আগে মাছির উৎপাত সামলাতে গিয়ে
খানিকটা মনোযোগ হারিয়েছিলেন অভিজ্ঞ এই ব্যাটার। ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে বল
স্টাম্পে আঘাত হানতেই থামে তার ১৭৯ বলে ৭১ রানের ইনিংস।
এরপর
ইবাদত হোসেনকে ফিরিয়ে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন আব্বাস। তখনও চারশ স্পর্শ
করেনি বাংলাদেশ। তবে শেষ জুটিতে তাসকিন আহমেদের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে কিছুটা
স্বস্তি পায় স্বাগতিকরা। ১৯ বলে ২৮ রান করেন তাসকিন, ছিল ৩ চার ও ১ ছক্কা।
নাহিদ রানাও ২৩ বল টিকে থাকেন। শেষ উইকেটে দুজন মিলে যোগ করেন ২৯ রান। শেষ
পর্যন্ত শাহিন আফ্রিদির বলে স্লিপে সৌদ শাকিলের দুর্দান্ত ডাইভিং ক্যাচে
তাসকিন ফিরলে ৪১৩ রানেই শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস।
এই রান তখন যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণই মনে হচ্ছিল। কিন্তু দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট।
বাংলাদেশের
সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে ধরা হচ্ছিল পেস আক্রমণকে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে
রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানকে হারানোর স্মৃতি ছিল টাটকা। কিন্তু মিরপুরের
দ্বিতীয় দিনে সেই পেস আক্রমণই ছিল একেবারে নিষ্প্রভ।
তাসকিন আহমেদ দেড় বছর পর টেস্টে ফিরে ছিলেন বিবর্ণ।
নাহিদ
রানা গতি তুললেও ছিলেন খরুচে। ইবাদত হোসেনও খুব একটা প্রভাব ফেলতে
পারেননি। মাঝে দুয়েকটি ভালো ডেলিভারি ছাড়া বাংলাদেশের বোলিংয়ে ধার বা
নিয়ন্ত্রণ কোনোটিই দেখা যায়নি। উইকেটও এদিন পুরোপুরি ব্যাটিং সহায়ক হয়ে
ওঠে। নতুন বলে সামান্য মুভমেন্ট থাকলেও পরে ব্যাটিং সহজ হয়ে যায়।
পাকিস্তানের দুই ওপেনার শুরু থেকেই ইতিবাচক ক্রিকেট খেলেন। প্রথম ১০ ওভারেই
স্কোর বোর্ডে উঠে যায় ৫০ রান।
ইমাম-উল-হক
ছিলেন শুরুতে আগ্রাসী। তবে পরে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন অভিষিক্ত আজান
আওয়াইস। নাহিদ রানার প্রথম বলেই হেলমেটে আঘাত পান তিনি। কিছুটা অস্বস্তিতে
পড়লেও দ্রুত সামলে নেন নিজেকে। পরে নাহিদকেই টানা তিনটি চার মেরে
আত্মবিশ্বাসের জানান দেন। ইমাম অবশ্য ২৩ রানে জীবন পেয়েছিলেন। ইবাদতের বলে
স্লিপে কঠিন ক্যাচ নিতে পারেননি মাহমুদুল হাসান জয়।
সেই
সুযোগ কাজে লাগিয়ে ৪৫ রান করেন পাকিস্তানি ওপেনার। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে
ফেরান মেহেদী হাসান মিরাজ। তার দারুণ এক ডেলিভারিতে এলবিডব্লিউ হন ইমাম।
১০৬ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙে তখন। তবে বাংলাদেশ স্বস্তি পায়নি। তিন নম্বরে
নেমে আব্দুল্লাহ ফাজাল শুরুতে ধীর ছিলেন। প্রথম ১৮ বলে রানই করতে পারেননি।
পরে নাহিদের বলে চমৎকার বাউন্ডারিতে খোলেন রানের খাতা। এরপর দারুণ সংযমী
ব্যাটিং করেন তিনি।
দিনের
সবচেয়ে বড় আলো অবশ্য কেড়ে নেন আজান আওয়াইস। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৩৩
ম্যাচে ১০ সেঞ্চুরি করা এই তরুণ তার প্রতিভার ছাপ রাখেন অভিষেক টেস্টেও।
দৃষ্টিনন্দন ড্রাইভ, কাট আর আত্মবিশ্বাসী ফুটওয়ার্কে বাংলাদেশের বোলারদের
বিপাকে ফেলেন তিনি। ৬৫ বলেই পূর্ণ করেন ফিফটি। দিনের শেষ পর্যন্ত অপরাজিত
থাকেন ৮৫ রানে। ১৩৩ বলের ইনিংসে মারেন ১২টি চার। অন্য প্রান্তে ২৩ বছর বয়সি
আব্দুল্লাহ ফাজাল অপরাজিত থাকেন ৩৭ রানে। শেষ বিকালে একটি সুযোগ দিলেও
কঠিন ক্যাচ নিতে পারেননি সাদমান ইসলাম।
দিন
শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ১ উইকেটে ১৭৯ রান। এখনও তারা পিছিয়ে ২৩৪ রানে।
তবে ম্যাচের গতি-প্রকৃতি এখন অনেকটাই বদলে গেছে। প্রথম দিনের নিয়ন্ত্রণ
হারিয়ে দ্বিতীয় দিনের শেষে চাপে পড়ে গেছে বাংলাদেশ। আর পাকিস্তান ফিরে
পেয়েছে আত্মবিশ্বাস, অনেকটাই দুই নবীন ব্যাটারের কাঁধে ভর করেই।